ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলি লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে 'অবিস্মরণীয় শিক্ষা' দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনি নিহত হওয়ার পর লারিজানির এই কড়া বার্তা বিশ্বব্যাপী উত্তেজনা বাড়িয়েছে। তিনি কে এই লারিজানি? তার রাজনৈতিক যাত্রা, পরিবার এবং বর্তমান ভূমিকা কী? আসুন বিস্তারিত জেনে নিই এই প্রভাবশালী ইরানি নেতার সম্পর্কে।
আলি লারিজানির পটভূমি: 'ইরানের কেনেডি' পরিবারের সদস্য
১৯৫৮ সালের ৩ জুন ইরাকের নাজাফে জন্মগ্রহণ করা আলি লারিজানি ইরানের একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। টাইম ম্যাগাজিন ২০০৯ সালে তার পরিবারকে 'ইরানের কেনেডি' বলে অভিহিত করেছে। তার পিতা মির্জা হাশেম আমোলি একজন বিখ্যাত ধর্মীয় পণ্ডিত ছিলেন। লারিজানির ভাইয়েরা ইরানের বিচার বিভাগ এবং অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। ২০ বছর বয়সে তিনি ফারিদেহ মোতাহারিকে বিয়ে করেন, যিনি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোর্তেজা মোতাহারির কন্যা। তার কন্যা ফাতেমেহ যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটিতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
শিক্ষাগতভাবে লারিজানি গণিত এবং কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক করেছেন শারিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে, এবং পশ্চিমা দর্শনে মাস্টার্স ও ডক্টরেট করেছেন তেহরান ইউনিভার্সিটি থেকে, যার থিসিস ছিল ইমানুয়েল কান্টের উপর। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তিনি ইরানিয়ান রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এ যোগ দেন।
কড়া বার্তা: আমেরিকা-ইসরায়েলকে 'হৃদয় পোড়ানোর' প্রতিজ্ঞা
১ মার্চ ২০২৬-এ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে লারিজানি বলেন, “আমেরিকা এবং জায়নবাদী শাসক [ইসরায়েল] ইরানি জাতির হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়েছে। আমরা তাদের হৃদয় পুড়িয়ে দেব। আমরা জায়নবাদী অপরাধী এবং লজ্জাহীন আমেরিকানদের তাদের কর্মের জন্য অনুতপ্ত করব।” তিনি আরও বলেন, “ইরানের সাহসী সৈনিক এবং মহান জাতি আন্তর্জাতিক দানবদের অবিস্মরণীয় শিক্ষা দেবে।” লারিজানি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে 'ইসরায়েলি ফাঁদে' পড়ার অভিযোগ করেন এবং বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করবে না। তিনি স্পষ্ট করেন, “আমরা আঞ্চলিক দেশগুলোকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছি না, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত যেকোনো ঘাঁটিকে লক্ষ্য করব।” এই বার্তা খামেনি এবং আইআরজিসি কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুরের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পর দেওয়া হয়েছে।
হামলার প্রেক্ষাপট: ইরানের সবচেয়ে বড় সংকট
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনি এবং পাকপুর নিহত হন, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরানের সবচেয়ে বড় সংকট। মৃতের সংখ্যা ৭৮৭-এ পৌঁছেছে। লারিজানি এই হামলাকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ধ্বংসকারী বলে অভিহিত করেছেন এবং ইসরায়েলকে যুদ্ধ জ্বালানোর জন্য দায়ী করেছেন। তিনি একটি ত্রিসদস্যবিশিষ্ট অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলের সঙ্গে নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজনৈতিক যাত্রা: প্রাগম্যাটিক নেতা থেকে কড়া অবস্থানে
১৯৯৪-১৯৯৭ সালে প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানির অধীনে সংস্কৃতি মন্ত্রী ছিলেন লারিজানি। ১৯৯৪-২০০৪ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবি-র প্রধান ছিলেন, যেখানে সংস্কারপন্থীদের সমালোচনার মুখে পড়েন। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডে যাননি। ২০০৫-২০০৭ সালে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি এবং নিউক্লিয়ার আলোচক ছিলেন, কিন্তু প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সঙ্গে মতভেদে পদত্যাগ করেন। ২০০৮-২০২০ সালে পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন তিন মেয়াদে, এবং ২০১৫ সালের জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নিউক্লিয়ার চুক্তি অনুমোদন করেন। ২০২১ এবং ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হন। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাকে পুনরায় সেক্রেটারি নিয়োগ করেন। অক্টোবর ২০২৫-এ তিনি আন্তর্জাতিক অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ)-এর সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি বাতিল করেন।
বিশ্লেষণ: প্রাগম্যাটিক থেকে কড়া অবস্থানে পরিবর্তন
বিশ্লেষকরা লারিজানিকে প্রাগম্যাটিক বলে মনে করেন, কারণ তিনি নিউক্লিয়ার চুক্তি সমর্থন করেছিলেন এবং ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ওমানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অপ্রত্যক্ষ আলোচনায় 'ইতিবাচক' অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু হামলার পর তার অবস্থান কড়া হয়েছে, যা ইরানের প্রতিক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তার অভ্যন্তরীণ প্রভাবের কারণে সম্ভাব্য সমঝোতার পথ খোলা থাকতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইরানের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। এই ঘটনা ট্রাম্পের 'দেলুসিয়াল ফ্যান্টাসি' বলে সমালোচিত হয়েছে।
এই সংকট মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্যকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ করছে। কূটনীতির পথ কি ফিরে আসবে, নাকি যুদ্ধ আরও বিস্তার লাভ করবে? সময়ই বলবে।