মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সম্মিলিত হামলা ইরানের ওপর। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই হামলাকে 'প্রতিরক্ষামূলক' বলে দাবি করলেও, বিশেষজ্ঞরা এবং বিরোধী রাজনীতিবিদরা বলছেন, ইরানের পক্ষ থেকে 'আসন্ন হুমকি'র কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ দেওয়া হয়নি। এই যুদ্ধকে 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, এটি ট্রাম্পের অতীতের যুদ্ধবিরোধী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কী ঘটছে এবং কেন? আসুন বিস্তারিত জেনে নিই।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল গত কয়েকদিন ধরে ইরানের নিউক্লিয়ার স্থাপনা, ব্যালিস্টিক মিসাইল ঘাঁটি এবং নৌবাহিনীকে লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই হামলা ইরানের 'আসন্ন হুমকি' প্রতিরোধ করার জন্য। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের নিউক্লিয়ার প্রোগ্রামকে গত জুনে ধ্বংস করা হয়েছে, কিন্তু তারা পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছে এবং দূরপাল্লার মিসাইল দিয়ে আমেরিকাকে আক্রমণ করার সক্ষমতা অর্জন করতে চলেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান আমেরিকান সম্পদে আক্রমণ করতে চলেছিল, তাই এটি 'প্রতিরক্ষামূলক'।
কিন্তু এই দাবিগুলোর পেছনে কোনো সুস্পষ্ট গোয়েন্দা তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে কংগ্রেসকে জানানো হয়েছে যে, ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আক্রমণের কোনো পরিকল্পনার প্রমাণ নেই। ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুসহ শতাধিক লোক নিহত হয়েছে, যা যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক ড্যারিল কিমবল বলেছেন, ইরানের নিউক্লিয়ার সক্ষমতা 'আসন্ন' নয়—তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত, এবং আন্তর্জাতিক ব্যালিস্টিক মিসাইল (আইসিবিএম) সক্ষমতা অর্জন করতে অন্তত ২০৩৫ সাল লাগবে। ডেমোক্র্যাট সেনেটর টিম কেইন এবং মার্ক ওয়ার্নার ক্লাসিফায়েড ব্রিফিংয়ের পর জানিয়েছেন, কোনো 'আসন্ন হুমকি'র প্রমাণ পাননি। তারা এই যুদ্ধকে 'যুদ্ধের নির্বাচন' বলে অভিহিত করেছেন এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করতে ওয়ার পাওয়ার্স আইনের প্রস্তাব করেছেন।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের প্রশাসন এই যুদ্ধকে 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির অংশ হিসেবে দেখছে। পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ বলেছেন, এটি ইরাক যুদ্ধের মতো 'রাষ্ট্রনির্মাণ' নয়, বরং মিসাইল, নৌবাহিনী এবং নিউক্লিয়ার হুমকি ধ্বংসের সুনির্দিষ্ট মিশন। হোয়াইট হাউসের অফিসিয়াল বিবৃতিতে এটিকে 'অপারেশন এপিক ফিউরি' বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এটি ইরানের ৪৭ বছরের আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়া।
রয়টার্স-ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকান জনগণের মধ্যে এই হামলার সমর্থন কম, অনেকে অনিশ্চিত। ট্রাম্পের ম্যাগা সমর্থকরা সমর্থন করলেও, মিডটার্ম নির্বাচনের আগে এটি তার প্রশাসনের জন্য ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি প্রমাণের অভাব প্রশাসনের গলায় ফাঁস হয়ে দাঁড়াবে।
এই যুদ্ধ ট্রাম্পের ২০১৮ সালে জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) থেকে সরে আসার ফল বলে সমালোচকরা মনে করেন, যা ইরানের নিউক্লিয়ার প্রোগ্রামকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল। বিশ্বব্যাপী উত্তেজনা বাড়ছে, এবং এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে। কূটনৈতিক সমাধানের পথ কি এখনো খোলা? সময়ই বলবে।