বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং পররাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে একের পর এক আলটিমেটাম জারি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতারা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর এই দাবি আরও জোরালো হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ছাত্রনেতারা সতর্ক করেছেন, দাবি না মানলে সারাদেশে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
আলটিমেটামের ক্রমবিকাশ
প্রথম আলটিমেটামটি ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এ জারি করেন ডাকসু ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) সাদিক কায়েম। সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাত করে ১৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে তিনি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিনটি দাবি পূরণের হুঁশিয়ারি দেন। দাবিগুলো না মানলে স্বরাষ্ট্র, আইন ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টাদের পদত্যাগ করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে।
এরপর, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫-এ (ওসমান হাদির মৃত্যুর দিন) ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ একই দাবিতে আরেকটি আলটিমেটাম জারি করেন। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, দাবি না মানলে সারাদেশের ছাত্র-জনতাকে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
দাবির কারণসমূহ
আলটিমেটামের পেছনে প্রধান কারণ হলো ওসমান হাদির উপর হামলা ও তার পরবর্তী মৃত্যু, যা অন্তর্বর্তী সরকারের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্দিষ্ট কারণগুলো নিম্নরূপ:
ওসমান হাদির হামলা সংক্রান্ত: ১২ ডিসেম্বর ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। হামলার মূল অভিযুক্ত ফয়সালসহ সকল দোষীদের গ্রেপ্তার, পরিকল্পনাকারীদের শাস্তি এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অবহেলার জন্য দায়ীদের বিচারের দাবি। এছাড়া, হামলাকে সমর্থনকারী 'সাংস্কৃতিক ফ্যাসিস্টদের' সামাজিক বয়কটের দাবি।
আইনশৃঙ্খলা ব্যর্থতা: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী চিরুনি অভিযান (যেমন 'অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২') চালানোর দাবি। গত তিন দিনে ৪,৩৬০ জন গ্রেপ্তার হলেও এটি অপর্যাপ্ত বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ অনেক সন্ত্রাসী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার না হলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্বশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ।
জামিন প্রক্রিয়ার অপব্যবহার: গ্রেপ্তারকৃত সন্ত্রাসীদের লাগাতার জামিন দেওয়া হচ্ছে, যা রাজনৈতিক সুপারিশ এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে হচ্ছে। এর দায় আইন উপদেষ্টার উপর বর্তায়।
ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ: শেখ হাসিনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের বিচারের দাবি। ভারতের অসহযোগিতার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সমালোচনা। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার দাবি।
এই দাবিগুলো জুলাই বিপ্লবের আদর্শ রক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উত্থাপিত, যা ওসমান হাদির লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত।
প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য প্রভাব
সরকার বা উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে সাদিক কায়েমের আলটিমেটামের সময় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন এবং গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, যদিও বিস্তারিত না। মুসাদ্দিক আলী সতর্ক করেছেন, দাবি না মানলে আন্দোলন অবশ্যম্ভাবী।
এই আলটিমেটাম দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। জুলাই বিপ্লবের সহযোদ্ধারা মনে করেন, এটি সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ করছে এবং নতুন আন্দোলনের সূচনা হতে পারে। ওসমান হাদির মৃত্যুর পর এই দাবি আরও জনপ্রিয়তা পেয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের স্থিতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।