জরিপের মূল ফলাফল এবং পদ্ধতি
আইআরআই-এর সেন্টার ফর ইনসাইটস ইন সার্ভে রিসার্চ (সিআইএসআর) দ্বারা পরিচালিত এই জরিপে জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটারদের পছন্দ সম্পর্কে স্পষ্ট ছবি তুলে ধরা হয়েছে। যদি এখনই নির্বাচন হয়, তাহলে:
দল/প্রতিষ্ঠান : সমর্থনের হার (%)
বিএনপি : ৩৩%
জামায়াতে ইসলামী : ২৯%
ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) : ৬%
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: ৫%
জাতীয় পার্টি : ৪%
অন্যান্য/অনিশ্চিত: বাকি %
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৬৬% "খুব সম্ভাব্য" বলে নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, আর ২৩% "কিছুটা সম্ভাব্য"। এছাড়া, ৮০% প্রত্যাশা করছেন যে নির্বাচন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হবে, যদিও ৬৭% অতীতের নির্বাচনগুলোকে জালিয়াতি-পূর্ণ বলে মনে করেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের কাজের প্রতি ৬৯% এবং সরকারের প্রতি ৭০% ইতিবাচক মতামত প্রকাশ করেছেন।
এই ফলাফলগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পরিবর্তনশীল ধারা নির্দেশ করে। আইআরআই-এর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সিনিয়র ডিরেক্টর জোহানা কাও বলেছেন, "বাংলাদেশিরা ইউনুসের নেতৃত্বে অগ্রগতি দেখছেন, যা স্থিতিশীলতা, জবাবদিহিতা এবং সংস্কারের প্রতি তাদের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করে।" তবে, এই জরিপের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে কিছু প্রশ্নও উঠেছে, যা পরবর্তী অংশে আলোচিত হবে।
পটভূমি: বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, এবং ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসে। এরপর থেকে দেশে ব্যাপক সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে – ১১টি কমিশন গঠিত হয়েছে, এবং জুলাই ন্যাশনাল চার্টারের মাধ্যমে ৮৪টি প্রস্তাবিত সংস্কারের খসড়া তৈরি হয়েছে। ন্যাশনাল কনসেনসাস কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই সংস্কার নিয়ে বিতর্ক চলছে। বিএনপি চায় চার্টারটি নির্বাচনের পর কার্যকর করা হোক, যাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের "অতি-অধিকার" না হয়, যেখানে জামায়াত এবং সংশ্লিষ্ট ইসলামপন্থী দলগুলো রেফারেন্ডামের মাধ্যমে নির্বাচনের আগেই এটি বাধ্যতামূলক করতে চায়।
আইআরআই-এর অক্টোবর ২০২৫-এর প্রি-ইলেকশন অ্যাসেসমেন্ট মিশনও এই বিতর্কের উল্লেখ করেছে। নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণে অগ্রগতি করেছে – ২১ লক্ষ মৃত ভোটার বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ৪৪ লক্ষ নতুন ভোটার যুক্ত করা হয়েছে। তবে, প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং মহিলাদের অপ্রতিনিধিত্বের মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এছাড়া, আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা প্রক্রিয়ার প্রতিনিধিত্বমূলকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে জরিপের ফলাফল বিএনপি এবং জামায়াতের মতো বিরোধী দলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়, যা ২০২৩-এর আইআরআই জরিপের তুলনায় (যেখানে আওয়ামী লীগের সমর্থন ছিল ৭০%-এর উপরে) একটি বড় পরিবর্তন।
উপসংহার
আইআরআই-এর এই জরিপ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি টার্নিং পয়েন্ট নির্দেশ করে – বিএনপি-জামায়াতের নিকটতা নির্বাচনী জোটের সম্ভাবনা এবং সংস্কার-কেন্দ্রিক রাজনীতির মধ্যে সংঘাত তৈরি করতে পারে। এটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা: সংস্কারগুলোকে দ্রুত এবং স্বচ্ছভাবে কার্যকর করতে হবে যাতে জনগণের আস্থা অটুট থাকে। তবে, জরিপের ফলাফলকে একক সত্য হিসেবে না নিয়ে বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করা দরকার। ২০২৬-এর নির্বাচন যদি স্বাধীন হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের একটি মাইলফলক হতে পারে; অন্যথায়, এটি নতুন অস্থিরতার বীজ বপন করবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এখনই সংলাপের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা, যাতে দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়।