ITGenius24 Logo

Sunday, March 15, 2026 08:29 PM

শরিফ ওসমান হাদি: জুলাই বিপ্লবের অকুতোভয় যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের প্রতীক

শরিফ ওসমান হাদি: জুলাই বিপ্লবের অকুতোভয় যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের প্রতীক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটেছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা, ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ও মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি (সাধারণত ওসমান হাদি নামে পরিচিত) আর নেই। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

ওসমান হাদির মৃত্যুতে গভীর শোকাহত দেশের রাজনৈতিক মহল, জুলাই বিপ্লবের সহযোদ্ধা এবং সাধারণ জনগণ। তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ এবং ইনকিলাব মঞ্চের অফিসিয়াল পোস্টে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

জীবন ও শিক্ষা
শরিফ ওসমান হাদি ঝালকাঠি জেলার নলছিটি গ্রামে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ছাত্র। শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন তিনি। একসময় ইংরেজি কোচিং সেন্টার সাইফুরস-এ শিক্ষকতা করেছেন এবং সর্বশেষ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস) লেকচারার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে তিনি তরুণ প্রজন্মের মাঝে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করেছেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ওসমান হাদি ছিলেন সম্মুখসারির এক অকুতোভয় যোদ্ধা। রামপুরা এলাকায় আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে তিনি রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সাহসী বক্তব্য এবং তীব্র প্রতিবাদ জুলাই বিপ্লবের আগুনকে আরও উসকে দেয়। "জান দিবো, তবু জুলাই দিবো না" – এই স্লোগান যেন তাঁর জীবনের মন্ত্র ছিল।

ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠা ও অবদান
বিপ্লবের পরপরই ওসমান হাদির নেতৃত্বে গড়ে ওঠে **ইনকিলাব মঞ্চ** – একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম। সংগঠনটির লক্ষ্য ছিল "সমস্ত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ"। শহীদদের স্মৃতি রক্ষা, অপরাধীদের বিচার, জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন – এসব দাবিতে শতাধিক কর্মসূচি পালন করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। দেশব্যাপী গ্রাফিতি, স্লোগান পুনর্লিখন, শহীদি সপ্তাহ পালন, অনশন, প্রদর্শনী ইত্যাদি কর্মসূচিতে তাঁর নেতৃত্ব অগ্রগণ্য ছিল।

ওসমান হাদি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর বক্তব্যে প্রায়ই উঠে আসত সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্ন। এ কারণে তিনি একদিকে সমর্থকদের কাছে নায়ক, অন্যদিকে সমালোচকদের কাছে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।

নির্বাচনী প্রচারণা ও হামলা
২০২৫ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন ওসমান হাদি। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরদিন, ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগর (বক্স কালভার্ট রোড) এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাঁকে গুলি করে। গুলিটি মাথায় লাগে, যা মারাত্মক মস্তিষ্কের ক্ষতি করে। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৮ ডিসেম্বর তিনি শহীদের মর্যাদায় চলে যান।

হামলার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল একাত্মতা প্রকাশ করে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসসহ অনেকে তাঁর সুস্থতা কামনা করেন।


ওসমান হাদির মৃত্যু জুলাই বিপ্লবের আদর্শকে আরও শাণিত করবে বলে মনে করেন তাঁর সহযোদ্ধারা। তিনি বলতেন, "এক হাদি চলে গেলেও লক্ষ হাদি জন্ম নেবে।" তাঁর লড়াই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পক্ষে এক অমর প্রতীক হয়ে থাকবে।

আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন এবং পরিবারকে ধৈর্য ধারণের তৌফিক দিন। জুলাই বিপ্লবের আদর্শ অমর।